সিলেট বিভাগের চলমান ছয় লেন সড়ক প্রকল্পে বালু সরবরাহের ব্যবসায় ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগের পর প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দুই অংশীদার। তাদের দাবি, বিনিয়োগের অর্থের হিসাব চাইতে গেলে শুধু ব্যবসা থেকে বঞ্চিতই করা হয়নি, বরং মারধর, প্রাণনাশের হুমকি এবং ভাড়াকৃত নৌকা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযোগ উঠেছে মা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর এলাকার ব্যবসায়ী কাজী নজরুল ইসলাম বাবুল (৫৫) সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আপাতত ড্রেজিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি মতিউর রহমান, কাজী নজরুল ইসলাম বাবুল এবং মো. আমির হোসেনের মধ্যে ১০০ টাকার ২০টি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বালু মিশ্রিত মাটি সরবরাহের ব্যবসায় বাবুল ২০ লাখ টাকা এবং অপর অংশীদার আমির হোসেন ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরবর্তীতে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার অলইতলি মৌজায় কুশিয়ারা নদী থেকে ৩০ লাখ ঘনফুট ভিটি বালু উত্তোলনের জন্য জেলা প্রশাসনের অনুমোদন পাওয়া যায়। তবে অনুমোদনের পর মতিউর রহমান এককভাবে বালু উত্তোলন ও ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকেন বলে অভিযোগ ওঠে।
কাজী নজরুল ইসলাম বাবুল দাবি করেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিছুদিন ব্যবসার কার্যক্রম তদারকি করতে না পারলেও পরে হিসাব-নিকাশ চাইলে মতিউর রহমান সন্তোষজনক কোনো হিসাব দেননি। বরং অংশীদারদের নিজেদের অংশের বালু উত্তোলন করে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এর ধারাবাহিকতায় গত ৯ জুলাই স্থানীয়দের সহযোগিতায় তারা বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নেন নজরুল। তবে নৌ-পুলিশের নির্দেশে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পরদিন ১০ জুলাই রানীগঞ্জ নৌ-পুলিশ ফাঁড়িতে যাওয়ার পথে মতিউর রহমান তাদের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি ঘটে ১৩ জুলাই। অভিযোগে বলা হয়েছে, অলইতলি এলাকায় কুশিয়ারা নদীর তীরে ভাড়াকৃত ড্রেজার ও নৌকা রাখার সময় মতিউর রহমান ও তার সহযোগীরা নৌকার মাঝিকে মারধর করেন এবং নৌকাটি জোরপূর্বক নিয়ে যান। এ সময় অভিযোগকারীদেরও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযোগকারী কাজী নজরুল ইসলাম বাবুল তার লিখিত আবেদনে বিনিয়োগকৃত অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, পাওনা অর্থ ফেরত, ভাড়াকৃত নৌকা উদ্ধার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নজরুলের দাবি, অংশীদারিত্বের চুক্তিপত্র, বিনিয়োগের প্রমাণসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং জেলা প্রশাসনের বালু উত্তোলনসংক্রান্ত অনুমোদনের কপি তার কাছে রয়েছে। তবে এসব নথির সত্যতা ও অভিযোগের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কাজী নজরুল ইসলাম বাবুল বলেন, মতিউর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে। পরে তিনি আমাকে ব্যবসায় অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেন। আমি এবং অপর অংশীদার আমির হোসেন সরল বিশ্বাসে ৫০ শতাংশ শেয়ারের অংশীদার হই।এরপর আমরা এখানে কোটি টাকার মতো আরো বিনিয়োগ করেছি।আমাদের কাছে তার অনেক প্রমাণাদি রয়েছে।আমি যখন অসুস্থ ছিলাম তখন তার কিছু আচরণ আমাকে সন্দিহান করে।এবং ধীরে ধীরে মতিউর অধিকাংশ শর্তই লঙ্ঘন করে নিজের মতো ব্যাবসা পরিচালনা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যের সরিয়ে নিতে থাকেন। আমাদের সঙ্গে রীতিমতো প্রতারণা করছেন তিনি।এই ঘটনার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, তিনি আরও অনেকের কাছ থেকে একইভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলাও রয়েছে।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অলইতলি এলাকায় বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বেশ কদিন ধরেই অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। যদিও প্রকাশ্যে কেউ এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মতিউর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপরিদর্শক সাব্বির এহসান বলেন, “গত ১৬ জুলাই পুলিশ সুপার বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ জুলাই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাই। অভিযুক্ত মতিউর রহমানকে সেখানে পাওয়া যায়নি। যেহেতু অংশীদারদের মধ্যে ব্যবসায়িক হিসাব নিয়ে বিরোধ রয়েছে, তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপাতত ড্রেজিং কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।”
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং আইনানুসারে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

