অতি বৃষ্টির সম্ভাবনার পূর্বাভাসে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও আগাম পাহাড়ি ঢল নামলে দুর্বল বা অসম্পূর্ণ বাঁধ দিয়ে পানি ঠেকানো কঠিন হতে পারে। এতে ঝুঁকিতে পড়তে পারে চলতি মৌসুমের বোরো ধান।
কানাডা প্রবাসী আবহাওয়া গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ তার এক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, আগামী ২৩ মার্চের মধ্যে সিলেট বিভাগের জেলাগুলোর উপর দিয়ে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই সময়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার আশঙ্কা, এ সময় আগাম পাহাড়ি ঢল নামতে পারে।
হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। পরে আবার এই সময় বর্ধিত করে ১৫ মার্চ পর্যন্ত করা হয়। তবে এই বর্ধিত সময়সীমা পার হওয়ার মাত্র দুদিন বাকি থাকার পরও জেলার বিভিন্ন হাওরে কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।অনেক এলাকায় এখনও বাঁধের কাজ চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ৯৫টি হাওরে চলতি মৌসুমে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এসব ফসল রক্ষায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ১৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ৭১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) কাজ করছে।যার মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বাস্তবে অনেক জায়গায় কাজের অগ্রগতি সরকারি হিসাবের সঙ্গে মিলছে না। তাদের মতে, সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও অনেক বাঁধে এখনও মাটি ফেলা বা সংস্কারের কাজ বাকি রয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক আবদুল করিম বলেন, “নির্ধারিত সময় তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন তো প্রায় দুই সপ্তাহ হয়ে গেল। তারপরও যদি বাঁধের কাজ বাকি থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে কাজ সময়মতো শেষ হলো না কেন?”
দিরাই উপজেলার কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, “আমাদের এলাকায় বাঁধের কিছু অংশে এখনও মাটি ঠিকভাবে দেওয়া হয়নি। বৃষ্টি শুরু হলে কাজ করা আরও কঠিন হয়ে যাবে। তাই আমরা এখন দুশ্চিন্তায় আছি।”
তাহিরপুর উপজেলার কৃষক নূর আলী বলেন, “২০১৭ সালে হঠাৎ ঢলে আমাদের সব ধান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এবারও যদি আগাম বৃষ্টি আর ঢল আসে, আর বাঁধ ঠিকভাবে না থাকে, তাহলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।”
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে অনেক বাঁধের মাটি ধসে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্লোজার অংশের কাজ অনেক জায়গায় ঠিকমতো হয়নি। তিনি জানান, অনেক বাঁধে শক্তভাবে নির্মাণের বদলে শুকনো মাটি দিয়ে ওপর থেকে প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল, যা অনেকটা ‘মেকআপ’ করার মতো। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সেই প্রলেপ সরে গিয়ে কাজের অনিয়ম দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ অবস্থায় টানা বৃষ্টিপাত হলে অনেক বাঁধই টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এমনকি বন্যা শুরুর আগেই সব কাজ শেষ করা যাবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদারকে ফোন দেওয়া হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, অতীতে আগাম পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে আকস্মিক ঢলে হাওরের অধিকাংশ বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতার কারণে চলতি মৌসুমে আবহাওয়ার এমন পূর্বাভাসে কৃষকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সম্ভাব্য অতিবৃষ্টি শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করা এবং নির্মাণমান নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে হাওরের একমাত্র বোরো ফসল বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

