logo
ads

ফসলরক্ষায় চাঁদা তোলে পানি নিস্কাশন করছেন কৃষকরা  

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশকাল: ৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৭ পি.এম
ফসলরক্ষায় চাঁদা তোলে পানি নিস্কাশন করছেন কৃষকরা  

ছবি: এফ টিভি

১৪ কিয়ার (বিঘা) জমিতে বোরো ধান করেছিলাম কিন্তু সবটাই পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম। শুধু আমার একার জমি নয়, গ্রামের শতশত কৃষকদের জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ধানের সমান সমান পানি, ধান যাতে পানিতে পচে না যায় তাই পাম্প দিয়ে হাওরের পানি কমানোর চেষ্টা চলছে। প্রতি কিয়ার জমির জন্য ২০০ টাকা করে দিয়ে গ্রামবাসী সাড়ে ৩ লাখ টাকা জমা করে তিন দিন ধরে ৬ টা বড় পাম্প বসিয়ে পানি নিস্কাশন করা হচ্ছে।
এভাবেই হাওরের বোরো ধান রক্ষার নিজেদের চেষ্টার কথাগুলো বলছিলেন, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরপাড়ের ফেনারবাঁক গ্রামের লিয়াকত আলী চৌধুরী। শুধু লিকায়ত আলী চৌধুরীরই নন জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছেন জেলার ছোট-বড় অন্তত ২০ টি হাওরের হাজারো কৃষক।
খোঁজ নিয়ে নিয়ে গেছে, সুনামগঞ্জ অঞ্চলে গেল মার্চ মাসে নিয়মিত বৃষ্টি হয়। এতে হাওরে বৃষ্টির পানি হাওরে জমতে থাকে। একই সময়ে হাওরের বোরো ফসলরক্ষায় হাওরের পাড়ে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ফলে হাওরের পানি নিস্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও কৃষকরা বাঁধ কেটে হাওরের পানি বের করার চেষ্টা করলে প্রশাসন বাধা দেয়।
অন্যদিকে হাওরের সাথে নদীর পানিও বৃদ্ধি পাওয়ায় বেকায়দার পড়েন কৃষকরা। তাই বাধ্য হয়ে পানি সেচার চেষ্টা চলছে। গত কয়েক দিন ধরে নিজেরা চাঁদা তোলে ডিজেল চালিত পাম্প বসিয়ে জেলার অন্তত ২০ টি হাওরের পানি সেচার চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
কৃষকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, পাম্প বসিয়ে হাওরের পানি নিস্কাশনের জন্য সদর উপজেলার দরিয়াবাজ গ্রামের কাছের দেখার হাওরের একটি অংশে ৫টি পাম্প বসানো হয়েছে, জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক গ্রামের কাছে পাগনার হাওরে ৬টি পাম্প বসানো হয়েছে, একই উপজেলার হালীর হাওরের রাতলা স্লুইস গেইট ৩৫ টি ও উলুকান্দি গ্রামের লেংটার কাড়া অংশে আরও ৫০ টি পাম্প দিয়ে পানি নিস্কাশন করা হচ্ছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার হরিপুর-ফতেপুর গ্রামের কাছে হালীর হাওরের একটি অংশে বসানো হয়েছে ৫ টি পাম্প। এছাড়াও ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনার তাল হাওরে ৫০টি, ধানকুনিয়া হাওরে ৩০ টি ও সোনামড়র হাওরে ২৫টি , মধ্যনগর উপজেলার বাইনচাপড়া, বোয়ালা, ঘোরাডোবা, কাইলানী, এরন বিল, মরিচাকুরি, মেঘনা, বরনি ও শালদিঘা হাওরের একইভাবে ১০ থেকে ১৫ টি করে পাম্প বসিয়ে পানি নিস্কাশন করা হচ্ছে।
দেখার হাওরের একটি অংশের পানি নিস্কাশনের জন্য শান্তিগঞ্জ উপজেলার কারারাই গ্রামের কাছে বাঁধ কেটে দিয়েছেন চিকারকান্দি ও কারারাই গ্রামের কৃষকরা। সদর উপজেলার ডাকুয়ার হাওরের বাঁধ কাটা নিয়ে কাঠইর ও মোহরপুর ইউনিয়নের দুই এলাকার লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মওসুমে সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর বোরো জমি চাষাবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মে.টন। যার বাজার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। জেলায় বোরো চাষী রয়েছেন প্রায় ১০ লাখ।
ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের ফজলে রাব্বি বলেন, চন্দ্রসোনার হাওরের প্রায় এক তৃতীয় জমি পানির নিচে। ৫০ টি পাম্প বসিয়ে পানি নিস্কাশনের চেষ্টা চলছে। চানপুর ও দুর্গাপুর কৃষকরা প্রতি বিঘা জমির জন্য ১০০ টাকা করে চাঁদা তোলে পানি নিস্কাশন করছেন। ধান তোলতে না পারলে কৃষকরা মাঠে মারা যাবেন, তাই নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ধান রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
মধ্যনগর উপজেলার ফারুকনগর গ্রামের কৃষক আতিক ফারুকি বলেন, বৃষ্টির পানিতে উপজেলার অন্তত ১০টি হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে, কাঁচা ধানের সমান পানি হওয়ায় সেগুলোও পঁচে যাচ্ছে। আমার ৫০ বিঘা জমির মধ্যে প্রায় ১০ বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়েছে।  শতশত পাম্প দিয়েও হাওরের পানি নিস্কাশন সম্ভব না। শুধুমাত্র ধান পচে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য কৃষকরা নিজ উদ্যোগে প্রতি বিঘা জমির জন্য ২ থেকে ৩শত টাকা চাঁদা সংগ্রহ করে হাওরের পানি হ্রাস করার চেষ্টা করছেন।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি মো. রাজু আহমদ বলেন, হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ অনেকাংশে দায়ী। পানি নিস্কাশনের রাস্তা না রেখেই হাওরের বাঁধ দেওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জেলার অন্তত ২০ টি হাওরের প্রায় ২০ হাজার জেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের এই দুর্যোগে সরকার কোন ভূমিকা পালন করছেন না। হাওরের ফসলরক্ষায় পরিকল্পিত বাঁধ দেওয়ার পাশাপাশি ও ভরাটকৃত নদী-নালা ও খাল-বিল খনন করতে হবে।‘  
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদার বলেন,‘ চলতি মওসুমে সুনামগঞ্জে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে হাওরের পাশাপাশি নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় হাওরগুলোর পানি নিস্কাশনের জন্য রেগুলেটর রয়েছে। কিন্তু হাওরের পানি ও নদী পানি একই লেভেলে থাকার কারণে অনেক হাওরের পানি নিস্কাশন হচ্ছে না। বোরো ফসলরক্ষার জন্য বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এখন সেই বাঁধ কেটে হাওরের পানি নিস্কাশন করা খুবই ঝুঁিকপূর্ন। বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা নিজ উদ্যোগে হাওরের পানি নিস্কাশন করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে প্রতিটি উপজেলার হাওরে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩১২৮ হেক্টর জমি আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষয়-ক্ষতির সঠিক তথ্য কয়েক দিন পর জানা যাবে। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছেন।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, হাওরের জলাবদ্ধতা সিরসনের জন্য গেল সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে সভা করা হয়েছে। সভায় বলা হয়েছে, যেখানে বাঁধ কাটা প্রয়োজন সেখানে প্রশাসন ও স্থানীয়দের সমম্বয়ে গঠিত কমিটি যাছাই বাছাই করে বাঁধ কাটতে হবে। বাঁধ কাটার আগে সম্ভাব্য সব পরিণতি বিবেচনায় নিতে হবে। বাঁধ কাটার প্রয়োজনীয়তা মনে হলে কাটার সময়ই বাঁধ মেরামতের পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে কাটা লাগবে।

এই বিভাগের আরও খবর

Advertisement

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ