সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর বোরো জমির ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় প্রতি বছরই শত কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা হয় মাটির বাঁধ। হাওরের বোরো ধান কাটার পর এসব মাটির বাঁধ পানিতে মিশে যায়। ২০১৮ সাল থেকে শুরু করে চলতি বছরসহ ৯ বছর ধরে দেওয়া হচ্ছে শত কোটি টাকার বাঁধ। বাঁধের মাটি ও পাহাড়ি ঢলের পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে নদী। নদী ভরাটের ফলে হাওরের পানি নিস্কাশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হাওরপাড়ের কৃষি ও কৃষক এবং নদী নিয়ে কাজ করার সংগঠনের দায়িত্বশীলরা বলছেন, নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা না করে প্রতি বছরই সমীক্ষা ছাড়াই অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে সাময়িক সময়ের জন্য ফসলরক্ষা করা হলেও হাওরের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, নদী খনন ও হাওরের বাঁধগুলো স্থায়ী করা ব্যয়বহুল ও সময়ের ব্যাপার। তাই কৃষকদের বোরো ফসল আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রতি বছরই ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। চলতি অর্থ বছরে বোরো ফসলরক্ষায় ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০২ কিলোমিটার ডুবন্ত ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। হাওরপাড়ের কৃষকদের দিয়ে ৭১৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে প্রকল্প বাস্তবায় কমিটি (পিআইসি) এসব কাজ করেছেন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ রয়েছে ১৭১৮ কিলোমিটার, পানি নিস্কাশনের ক্লোজার রয়েছে ১১০টি। এরমধ্যে ৪৮টি হাওরের বোরো ফসলরক্ষায় ডুবন্ত মাটির বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। ইতোমধ্যে ১২ কিলোমিটার বাঁধ স্থায়ী করা হয়েছে।
হাওরের বোরো ফসলরক্ষায় কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) নীতিমালা পরিবর্তন করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে প্রথম ৮০ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৫১ কিলোমিটার মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে প্রায় ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৩৩ কিলোমিটার, ২০২০-২১ অর্থ বছরে ১০৯ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬১৯ কিলোমিটার , ২০২১-২২ অর্থ বছরে সাড়ে ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩৬ কিলোমিটার, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৩৭ কিলোমিটার, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ১০১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০০ কিলোমিটার, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৯৩ কিলোমিটার ডুবন্ত মাটির বাঁধ নির্মাণ ও সংকার করা হয়।
কৃষক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, শুকনো মওসুমে প্রতি বছরই মাটির নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। এরপর বর্ষায় এসব বাঁধের মাটি পানিতে বিলীন হয়ে যায়। শত কোটি টাকা জলে যায়।
জামালগঞ্জ উপজেলার কামিনীপুর গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল হান্নান বলেন, পলি পড়ে সব নদী ভরাট হয়ে গেছে। সুরমা-বৌলাই নদীর আগে যেসব স্থানে চৈত্র মাসে ২০-৩০ হাত পানি থাকত সেখানে এখন নৌকা আটকে যায়। যার কারণে হাওরের পানি এখন নদীতে যায় না। নদী খনন না করে প্রতি বছরই হাওরে বাঁধ দেওয়া হয় কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বর্ষায় বাঁধের মাটি পানিতে গলে যায়। ফলে কৃষকদের দুর্ভোগ কমছে না।
হাওর এরিয়া আপলিস্টমেন্ট সোসাইটি (হাউস) এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, হাওরের ফসলরক্ষায় মাটির বাঁধ নির্মাণ সাময়িক সমস্যার সমাধান। হাওরে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষায় এপ্রিল পর্যন্ত এই বাঁধের প্রয়োজন থাকায় স্থায়ী বাঁধ করা উচিত না। তাই কাল বিলম্ব না করে দ্রুত সুনামগঞ্জের সকল নদ-নদী খনন করতে হবে। নদী খনন হলে হাওরের পানি নিস্কাশন হবে ও আগাম বন্যার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।‘
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, প্রতি বছরই হাওরের ফসলরক্ষার নামে অপরিকল্পিতভাবে শত কোটি টাকা ব্যয়ে কয়েকশত কিলোমিটার মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সেই বাঁধের অধিকাংশ মাটি নদীতে ও হাওরে মিশে যায়। অন্যদিকে বন্যার সময় পলি জমেও নদী ভরাট হয় কিন্তু নদীগুলো খনের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। যার ফলে প্রতি বছরই বৃষ্টি ও আগাম বন্যার দেখা দিলে সবার আগে হাওরের বোরো ফসলের ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজারো কৃষক।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, ২০১৭ সাল থেকে বাঁধের কাজে প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কোন ধরনের গবেষণা ও সমীক্ষা ছাড়া অবৈজ্ঞানিকভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে হাওরের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাঁধের কারণে হাওরের পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। বোরো ফসলরক্ষায় স্থানীয় কৃষক ও গবেষকদের বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানের সমন্বয়ে সমাধান খোঁজে বের করতে হবে। আমরা মনে করি বাঁধের চেয়ে নদী ও খাল খননে গুরুত্ব দিতে হবে।‘
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদার বলেন,‘ সুনামগঞ্জের ১৯ টি নদীর ৪০০ কিলোমিটার খনন করার জন্য দুই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছিল। পরে সেটি সংশোধন করে ১৩ টি নদীর ৩০৩ কিলোমিটার খননের জন্য ১৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাওর এলাকায় আরও ৪০০ কিলোমিটার নদী ও খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নদী ও খাল খনন বাস্তবায়ন হলে সুনামগঞ্জের কৃষকরা উপকৃত হবেন।
তিনি আরও বলেন, সমীক্ষা করার পরই হাওরের বাঁধের কাজ করা হচ্ছে। এখন নতুন করে কোন বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে না। আগে করার বাঁধগুলো সংস্কার করা হয়ে থাকে। ফসলরক্ষা বাঁধ স্থায়ী করা সম্ভব নয়, কারণ একটি ব্যয়বহুল। প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এছাড়া হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষায় সব বাঁধ স্থায়ী করা সম্ভব না।‘

