নির্দিষ্ট সময় শেষ গেলেও শেষ হয়নি সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু এখনও বাঁধের অনেক কাজ শেষ হয়নি।হাওরপাড়ের কৃষক ও কৃষক সংগঠনের দাবি- চলতি বোরো মওসুমে বাঁধের কাজ ধীর গতিতে চলছে। কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। অনেক এখনও বাঁধে মাটির কাজ চলছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, সঠিকভাবেই বাঁধের কাজ চলছে। ৭৬ ভাগ কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১০ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে।জানা যায়, সুনামগঞ্জের ১২ টি উপজেলার ৯৫ টি হাওরে চলতি বোরো মওসুমে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছে। ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মে. টন। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এসব ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে ১৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধানে কৃষকদের নিয়ে গঠিত ৭১৪ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) বাঁধের কাজ করছে। প্রতি বছরের ন্যায় গেল ১৫ ডিসেম্বর বাঁধের কাজ শুরু করলেও আগামীকাল শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ করার কথা থাকলেও অধিকাংশ বাঁধের মাটির কাজই শেষ হয়নি। পিআইসির অনুকূলে অর্থ ছাড় হয়েছে ৪৭ কোটি টাকা।
তাহিরপুর উপজেলার বলদার হাওরপাড়ের বাদঘাট ইউনিয়নের ইউনুছপুর গ্রামের কৃষক সাজিদ মিয়া খন্দকার বলেন,‘এইবার বাঁধের কাজ ধীরগতিতে চলছে। বলদার হাওরের ধরুন্দের বাঁধের একটি অংশে এখনও কাজ শুরু হয়নি। এছাড়াও অন্য বছর বাঁধের কাজের পাশে সাইনবোর্ড থাকলে এইবার কোন সাইনবোর্ড টানানো হয়নি। এলাকার সাধারণ মানুষ জানে না কত টাকার কাজ, কারা কাজ করছে। পাহাড়ি ঢল আসলে বাঁধের কাজ করা সম্ভব হবে না এবং হাওরে পানি ঢুকার আশংকা রয়েছে।
’শান্তিগঞ্জ উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামের কৃষক রকিব উদ্দিন বলেন,‘হাওরে বোরো ধানের চারা রোপন হয়েছে দুই মাস আগে। বাঁধের কাজের মেয়ায়ও প্রায় শেষ কিন্তু বাঁধের শতভাগ কাজ শেষ হয়নি। কাজও অন্য বছরের মত হচ্ছে না। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে ও আগাম বন্যা আসলে হাওর ঝুঁিকতে পড়তে পারে।’হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন,‘ প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। কারণ প্রথম বরাদ্দ ছিল ১৪৫ কোটি টাকা, পরে বৃদ্ধি করে ১৪৮ কোটি করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যের সাথে হাওরের বাঁধের কাজের কোন মিল নেই। শুরু থেকে বাঁধের কাজে ঢিলেমি ছিল। অক্ষত বাঁধে অনেক বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের যোগসাজশে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন চলছে। আগাম বন্যা আসলে এই বাঁধ দিয়ে ফসলরক্ষা করা সম্ভব হবে না, ফসলহানী হতে পারে। বাঁধের কাজ নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রশাসন ও মনিটরিং কমিটি দায় এড়াতে পারেন না। যদি কোন কারণে হাওরডুবির ঘটনা ঘটে তাহলে দায়ভার তাদেরকে বহন করতে হবে।’তিনি আরও বলেন,‘ বাঁধের কাজের ১৪৮ কোটি টাকা ররাদ্দের বিষয়ে হাওরের কৃষকরা জানেন না। আমরা বহু পিআইসির কাজ ঘুরে দেখেছি কোন সাইনবোর্ড নেই। যার কারণে স্থানীয় লোকজন কাজের বরাদ্দ নিয়ে কোন তথ্য জানতে পারছেন না। আমাদের ধারনা দুর্নীতির জন্য তথ্য গোপন রাখতে সাইনবোর্ড টানানো হয়নি। ’হাওরে বোরো ফসলরক্ষায় ডুবন্ত বাধ নির্মাণ ও বাস্তবায়ন এর জেলা কমিটির সদস্য সচিব সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী- মো. মামুন হাওলাদার বলেন,‘ নির্বাচনের কারণে বাঁধের কাজে কিছু বিলম্ব হয়েছে। তবে সব বাঁধের ক্লোজারগুলো ঝুঁকিমুক্ত করা হয়েছে। জেলা কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে কিছু সময় বাড়িয়ে আগামী ১০ মার্চের মধ্যে সব কাজ শেষ করা হবে। বাঁধের ৭৬ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কাজের পাশে সাইনবোর্ড টানানোই থাকে, অনেক সময় চুরি হয়ে যায়। শুরুতে সব বাঁধেই সাইনবোর্ড ছিল। যেহেতু কাজ শেষের দিকে হয়ত বিভিন্ন জায়গায় চুরি হতে পারে। পিআইসিকে দ্রুত সাইনবোর্ড টানানোর জন্য বলা হবে। নীতিমালা মেনে কাজের মান নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই চেষ্টা করছেন। ’

