একই গ্রামের দুইজন দীর্ঘদিন প্রেম করে মাত্র ৫ মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রেম সফল হয়নি, সংসারও করা হয়নি। ছেলের পরিবার বিয়ে মেনে না নেওয়ায় ৫ মাস পরও বাসরঘর হয়নি তাদের। রাগে-অভিমানে ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে স্বামী ও স্ত্রী দুইজন আত্মহত্যা করেছেন।
স্বামী-স্ত্রী হলেন, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের আজিজুর রহমান অরফে কুঞ্জন মিয়ার ছেলে মাহফুজুর রহমান (১৮) ও তার স্ত্রী একই গ্রামের মোর্শেদ মিয়ার মেয়ে মনিকা আক্তার (১৫)। আজ রবিবার সকাল ১০ টার দিকে দিরাই উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের মাহফুজুর রহমানের বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে।
স্বামীর বাড়ির লোকজনের দাবি, দাম্পত্য কলহের জের ধরে স্বামী-স্ত্রী বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে স্ত্রীর বাড়ির লোকদের অভিযোগ, প্রেমের বিয়ে মেনে না নিয়ে শ্বশুর বাড়ির লোকজন প্রায়ই মনিকাকে নির্যাতন করতেন। মনিকার খাবারের সাথে বিষ জাতীয় কিছু মিশিয়ে দিলে সেই খাবার খেয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়লে খবর পেয়ে তার স্বামী মাহফুজও সেই খাবার খেয়ে মারা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিরাই উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের গার্মেন্টকর্মী মাহফুজুর রহমান মোবাইল ফোনের কথা বলা থেকে প্রেম করে একই গ্রামের মনিকা আক্তারকে বিয়ে করেন ৫ মাস আগে। কিন্তু মাহফুজের পরিবার সেই বিয়ে মেনে নেয়নি। শর্ত অনুযায়ী বিয়ের পরই মাহফুজকে কাজের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। সম্প্রতি বাড়ি ফিরলেও পৃথকভাবে থাকতে হত মনিকা ও মাহফুজকে। একদিন মাহফুজ ও মনিকাকে একত্রে দেখতে পেয়ে মাহফুজকে গালাগাল ও মারধর করে তার বাবা। পরে রাগে ও অভিমানে দুই জন একসাথে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইঁদুর মারার কথা বলে ছোট ভাইকে দিয়ে বাজার থেকে চারটি বিষের ট্যাবলেট আনায় মাহফুজ।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রী একসাথে ইঁদুর মারার ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যার কথা থাকলেও মনিকা আগেই দুইটি ট্যাবলেট খেয়ে ফেলে এবং মোবাইল ফোনে স্বামীকে জানায়। পরে স্বামী মাহফুজ হাওর থেকে বাড়ি ফিরে এসে দুইটি ট্যাবলেট খেয়ে খেয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। দুইজনকে দ্রুত উদ্ধার করে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মনিকা আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য মাহফুজকে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মনিকার চাচা (তার বাবার চাচতো ভাই) বদরুল আলম বলেন, পছন্দ করে বিয়ে করায় মনিকাকে মেনে নিতে পারেনি তার পরিবার। নানাভাবে নির্যাতন করত, স্বামী স্ত্রীকে আলাদা ঘরে রাখত। আজ সকালে মনিকার খাবারের সাথে বিষ দিয়ে দেওয়ার পর সেই খাবার খেয়ে মনিকা অসুস্থ হয়ে পড়লে মাহফুজও সেই খাবার খেয়ে ফেলে। পরে দুইজনই মারা যায়। আমরা এই মৃত্যুর ঘটনার সুষ্টু তদন্ত চাই। পুলিশ আজকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়েছে। আমরা আগামীকাল থানায় অভিযোগ দাখিল করব।
মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা রফিনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, যতদূর জানি মাহফুজ ও মনিকার মৃত্যুর জন্য মাহফুজের পরিবার অনেকটাই দায়ী। তারা এই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। বিয়ের পর বাসর ঘরই করা হয়নি তাদের, শর্ত অনুযায়ী মাহফুজকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সম্প্রতি মাহফুজ বাড়ি ফিরলেও স্বামী-স্ত্রীকে নাকি পৃথক ঘরে রাখা হত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাহফুজকে মারধরও করা হয়েছে। রাগে-অভিমানে নাকি তারা একসাথে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং এই ঘটনা ঘটিয়েছে। শুনেছি মনিকার চাচা বদরুল আলম থানায় অভিযোগ করবেন।
মাহফুজের পিতা আজিজুর রহমান জানান, আজ রবিবার সকালে তার স্ত্রী ও পুত্রবধূ রান্না শেষে পরিবারের সবাইকে খাবার পরিবেশন করেন। খাবার শেষ করে তিনি হাওরে ধান কাটতে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পরই খবর পান বাড়িতে দুর্ঘটনা ঘটেছে। দ্রুত বাড়িতে ফিরে তিনি রান্নাঘরে ছেলে ও পুত্রবদূকে বিষপান করা অবস্থায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন এবং দ্রুত দিরাই হাসপাতালে নিয়ে যান। পুত্রবধূকে তারা কোন ধরনের নির্যাতন করেননি। তার ছেলে ও পুত্রবধূর নিজেদেরর কোন ঝামেলা থেকেই এই কাজ করেছে।
দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. প্রশান্ত তালুকদার জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই মনিকার আক্তারের মৃত্যু হয়েছিল।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এনামুল হক চৌধুরী বলেন, মির্জাপুর গ্রামের কম বয়সী স্বামী-স্ত্রী আজ সকাল ১০ টার দিকে বাড়িতে বিষপান করে, পরে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। কী কারণে তারা আত্মহত্যা করেছে তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। এই ঘটনায় কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবে পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ময়না তদন্তের জন্য স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

