পরিবারের সচ্ছলতার আশায় ভিটেমাটি আর সম্বল বিক্রি করে ভাগ্য বদলের স্বপ্নে ইউরোপের পথ ধরেছিলেন দুই তরুণ। কিন্তু দালালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রীসে পৌঁছানোর সময় থেকে তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। গত ৭ মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন তারা। এদিকে স্বজনদের ক্রমাগত আশ্বাসের মিথ্যা নাটক ঝুলিয়ে হঠাৎ বসতবাড়িতে তালা মেরে গ্রাম ছেড়ে চম্পট দিয়েছে দালাল পরিবার।
নিখোঁজ দুই যুবক হলেন, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের বড় নগদীপুর গ্রামের আতিকুর রহমান (১৯) ও কাউয়াজুরি গ্রামের এয়র মিয়া (২৪)। অভিযুক্ত দালাল চক্রের মূল হোতা ইতালিপ্রবাসী রাজু মিয়া ও তার বাবা স্বাধীন মিয়া, তাদের বাড়ি ছোট নদগীপুর গ্রামে।
নিখোঁজ আতিকুরের পরিবার জানায়, ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে ৮টি গরু বিক্রি ও জমি বন্ধক রেখে স্বাধীন মিয়ার হাতে সাড়ে ৮ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন বাবা ফরিদ মিয়া। অন্যদিকে এয়র মিয়ার বাবা গুলজার মিয়ার পরিবারও দিয়েছিল ৯ লাখ টাকা।
গত পৌষ মাসে বোট বা গেইমের মাধ্যমে তাদের সাগরপথে গ্রীসে পাঠানোর পর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পরিবার থেকে। আতিকুর রহমান ও এয়র মিয়ার পরিবারের সদস্যরা রাজু মিয়া ও স্বাধীন মিয়ার কাছে যোগাযোগ করলে কখনও দ্বীপে আটক, আবার কখনও গ্রীসে পাঠানোর চেষ্টা চলছে বলে তালবাহানা করে।
চাপে পড়ে গ্রামের কয়েক দফা সালিশে এয়র মিয়ার পরিবারকে কিছু টাকা ফেরত দিলেও আতিকুরের পরিবারকে এক টাকাও দেয়নি দালালরা। এরপরই বসতবাড়িতে তালা ঝুলিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় স্বাধীন মিয়ার পরিবার।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে নদগীপুর গ্রামের স্বাধীন মিয়ার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ইটালিতে অবস্থানরত তার ছেলে রাজু মিয়ার সাথে ওয়াটস অ্যাপে যোগাযোগ করলে তিনি সবকিছু অস্বীকার করে অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন। আতিকুর রহমান ও এয়র মিয়া নামের কাউকে তিনি চিনেন না বলে জানান।
নিখোঁজ থাকা আতিকুর রহমানের বাবা ফরিদ মিয়া জানান, ৭ মাস আগে গেল বছরের পৌষ মাসে ১৩ লাখ টাকায় স্বাধীন মিয়ার পরিবারের সাথে মৌখিক চুক্তিতে তার দ্বিতীয় ছেলে আতিকুর রহমানকে গ্রীসে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। এরপর ৮ টি গরু বিক্রি, নিজের রাখা বন্দক জমি অন্যকে দিয়ে ও ২ লাখ টাকা ঋণ করে সাড়ে ৮ লাখ টাকা স্বাধীন মিয়ার কাছে তোলে দেন। স্বাধীন মিয়ার ভাই ফুল মিয়া ও স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর আলমের হাতে গণনা করে টাকাগুলো দেওয়া হয়।
ফরিদ মিয়া বলেন, ৭ মাস আগে আতিকুরকে সাগর পথে লিবিয়া থেকে গ্রীসে পাঠানোর কথার পর কোন যোগাযোগ নেই ছেলের সাথে। স্বাধীন মিয়া ও তার ছেলের কাছে ছেলের সন্ধান জানতে চাইলে-বলেন একটি দীপের কারাগারে আটক আছে, একেক সময় একেক ধরনের কথা বলে। তাকে গ্রীসে পাঠানোর চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছিল স্বাধীন মিয়া ও তার ছেলে রাজু মিয়া। সম্প্রতি স্বাধীন মিয়ার পরিবার ঘর-বাড়ি তালাবদ্ধ করে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে । স্বাধীন মিয়ার পরিবার বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমরা কী করব চিন্তা করে বুঝে উঠতে পারছি না।’
নিখোঁজ এয়র মিয়ার মিয়ার বাবা গুলজার মিয়া বলেন, আমার বড় ছেলে এয়র মিয়াকে গ্রীসে পাঠানোর জন্য নগদীপুরের স্বাধীন মিয়ার পরিবারের সাথে আলোচনা করে ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়। স্বাধীন মিয়ার ছেলে রাজু মিয়া আমার ছেলেকে লিবিয়া নিয়ে কয়েক মাস রাখে। এরপর ৭ মাস আগে বলছিল, লিবিয়া থেকে গেইমের মাধ্যমে (ছোট বোটে করে সাগরপথে) নাকি গ্রীসে পাঠাচ্ছে, এরপর থেকে আর কোন খোঁজ-খবর নাই। ’
তিনি আরও বলেন, ছেলের অবস্থান ও টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়ে নদগীপুর, কাউয়াজুরি, ছয়হারা, দৌলতপুর গ্রামের লোকদের নিয়ে ৩-৪ বার সালিশ করেছি। কয়েক দফা সালিশের পর স্বাধীন মিয়া মাত্র আড়াই লাখ টাকা ফেরত দিয়েছে। বাকী টাকা ফেরত দেয়নি, ছেলের কোন খবরও দিচ্ছে না। এখন স্বাধীন মিয়ার বাড়ি-ঘর তালা দেখা যাচ্ছে, সবার মোবাইল নাম্বারও বন্ধ। ছেলের চিন্তায় ঘুম আসে না, আমি দুই বার স্টোকে আক্রান্ত হয়েছি।’
জগদল ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুর আলম বলেন, স্বাধীন মিয়ার পরিবারের মাধ্যমে গ্রীসে যেতে ইচ্ছুক দুই যুবক নিখোঁজ থাকার ঘটনাটি সত্য। পুরো এলাকার মানুষই জানেন। গুলজার মিয়ার অভিযোগের পর চার গ্রামের একাধিকবার সালিশ হয়েছে, স্বাধীন মিয়া ৩ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছে। এখন স্বাধীন মিয়ার ঘরবাড়ি বেশ কিছুদিন তালাবদ্ধ দেখা যাচ্ছে। দুই যুবকের পরিবার আইনগত কোন ব্যবস্থা নিতে চাইলে আমরা যতটুকু জানি সেটুকু বলবো। ’
এ বিষয়ে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এখনও এ সংক্রান্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

