logo
ads

জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের কাঁচা ধান

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশকাল: ১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৯ এ.এম
জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের কাঁচা ধান

ছবি:এফ টিভি

৩২ কিয়ার জমিন (চাষাবাদ) করছিলাম। ৫-৬ শ মন ধান অইলয়। কিন্তু মেঘের (বৃষ্টি) পানিত বেশিরভাগ তলাইয়া গেছে। হাওরে পানি বার হওয়ার (নিস্কাশন) পথ বান (বাঁধ) দিয়া রাখছে। আমার আড়াই লাখ টেকা করচ অইছে। অকন গরু-বাছুর কিতা দিয়া পালমু আর নিজে কিতা কাইমু। হাওর থেকে ধান তোলতে না পারলে না খেয়ে থাকতে হবে, গরু-ছাগল বিক্রি করতে হবে।
বৃষ্টির পানিতে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার বিষয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক আলাল মিয়া।
অভিযোগ করেন তিনি বলেন, দেখার হাওরের পানি নিস্কাশনের রাস্তায় একটি বাঁধ দিয়ে রাখা হয়েছে। কৃষকরা বাঁধ কেটে পানি নিস্কাশন করতে চায় কিন্তু প্রশাসনের বাধার কারণে বাঁধ কাটতে পারছেন না, হাওরের পানিও নিস্কাশন হচ্ছে না।
একই এলাকার কলাউড়া গ্রামের কৃষক মুহিবুর রহমান বলেন, আমার ৩৫ কিয়ার জমির কাঁচা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব জমি চাষাবাদ করতে সাড়ে ৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অসময়ে ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ৫ হাজার টাকার ধানও পাব না। হাওরের পানি নিস্কাশনের জন্য আমরা ইউএনও, ডিসি, পানি উন্নয়নের অফিসারসহ নেতাদের কাছে বার বার গিয়েছি কিন্তু পানি নিস্কাশনের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
শুধু দেখার হাওরই নয় বৃষ্টির পানিতে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে জেলার প্রায় সকল উপজেলায়। এমন পরস্থিতির শিকার হয়েছেন হাজারো কৃষক। কৃষকদের অভিযোগ, হাওরের বোরো ফসলরক্ষার নামে অপরিকল্পিত বাঁধ দেওয়ার কারণে হাওরের পানি নিস্কাশনে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। দিনে দিনে জলাবদ্ধতার পরিমান বাড়ছে। যদিও জলাবদ্ধতা ও ক্ষয়-ক্ষতির কোন তথ্য নেই জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে।
এদিকে অতিবৃষ্টির কারণে হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সোমবার বিশেষ সভা করেছে জেলা প্রশাসন। সভায় জেলা-উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। ফসলরক্ষা বাঁধের কারণে হাওরের ভেতরে জমে থাকা পানি ধান পাকার আগেই তলিয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ছোট বড় ৯৫ টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১০ হেক্টর বোরো জমি চাষাবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মে.টন। যার বাজার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। এসব জমির ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০২ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করতে কৃষকদের দিয়ে ৭১৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে প্রকল্প বাস্তবায় কমিটি (পিআইসি)।
জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের রিতেন তালুকদার বললেন, চৈত্র মাসের শুরু থেকেই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমাদের গ্রামের সামনের গজারিয়া ও ডাবাচোরা হাওরের অর্ধেক জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। হাওরের পানি নিস্কাশনের কোন আমি ৭ বিঘা জমি চাষ করেছিলাম ৪ বিঘা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এসব ধান পচে যাবে, কোনভাবেই কাটা যাবে না। আরও বৃষ্টি হলে অন্যান্য হাওরের ধানও পানির নিচে তলিয়ে যাবে।‘  
হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের তাহিরপুর উপজেলার সদস্য সচিব পাটাবুকা গ্রামের কৃষক রিপচান হাবিব বলেন, বৃষ্টির পানিতে মাটিয়ান হাওর ও গুরমার বর্ধিতাংশে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ধীরে ধীরে পানি বাড়ছে, যদি ভারি বৃষ্টি হয় তাহলে ধান পানির নিচে তলিয়ে পচে যাবে। বিভিন্ন হাওরের পরিস্থিতি দেখা মনে হচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্নের সলিল সমাধি হচ্ছে হাওরের পানিতে। ‘
সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সদস্য রেদুয়ান আলী রায়হান বক্তারা বলেন,‘ দেখার হাওরের উথারিয়া-পাথারিয়া এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দেওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি জমে হাওরে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অন্তত ১৮টি গ্রামের কৃষকদের শত শত হেক্টর জমির কাঁচা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ‘
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরের বোরো ধান উদপাদন ও কর্তন বিষয়ে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। পানি নিস্কাশনের বিষটি পানি উন্নয়ন বোর্ড দেখভাল করেন। বৃষ্টির পানি জমে হাওরের নিচ এলাকায় কিছু পানি জমছে। এখন পর্যন্ত বড় ক্ষয়-ক্ষতির কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য জেলা প্রশাসক উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করছেন।‘
পানি নিস্কাশনের বিষয়ে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন,‘ হাওরের বোরো ফসলরক্ষার জন্য স্থানীয় কৃষকদের দাবির প্রেক্ষিতেই মাটির ডুবন্ত বাঁধ দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টিতে হাওরের পাশাপাশি নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় হাওরের বাঁধ কেটে পানি নিস্কাশন করা খুবই ঝুঁিকপূর্ন কাজ। দেখার হাওরের উথারিয়া-পাথরিয়া বাঁধের নিচে তিনটি পাইপ দিয়ে দেখার হাওরের পানি নিস্কাশিত হচ্ছে তবে পানি প্রবাহ কম, কারণ মহাসিং নদীতেও পানি রয়েছে। ’
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, হাওরের জলাবদ্ধতা সিরসনের জন্য সোমবার সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে সভা করা হয়েছে। সভায় বলা হয়েছে, যেখানে বাঁধ কাটা প্রয়োজন সেখানে প্রশাসন ও স্থানীয়দের সমম্বয়ে গঠিত কমিটি যাছাই বাছাই করে বাঁধ কাটত হবে। তবে ৬ এপ্রিলের পূর্বে কাটা বাঁধ আবার মেরামত করতে হবে। বাঁধ কাটার প্রয়োজনীয়তা মনে হলে কাটার সময়ই বাঁধ মেরামতের পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে কাটা লাগবে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, হাওরের পানি নিস্কাশনের বিষয়ে ইউএনও, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, পানি উন্নয়ন বোর্ডের শাখা অফিসার ও কৃষি কর্মকর্তাকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটিই সিদ্ধান্ত নেবে বাঁধ কাটা উচিত হবে কি না। বাঁধ কাটার আগে সম্ভাব্য সব পরিণতি বিবেচনায় নিতে হবে। আগামী ৬ তারিখে বাংলাদেশ ও মেঘালয়েও ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে বাঁধ কাটা হবে, যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি নিষ্কাশনের পর ৫-৬ তারিখের মধ্যেই আবার বাঁধ বন্ধ করা সম্ভব হয়।

এই বিভাগের আরও খবর

Advertisement

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ