বাবার পাশে একই বিছানায় ঘুমিয়েছিল ৫ বছরের শিশু তুহিন মিয়া। কে জানত এটাই তার জীবনের শেষ ঘুম, বাবার হাতেই প্রাণ যাবে তার, আর জাগবে না সে। মধ্যরাতে ছেলে তুহিনকে কোলে করে ঘরের বাইরে নিয়ে যান বাবা আব্দুল বাছির। এরপর নিজের ভাই নাছির ও ভাইপো শাহরিয়ারের সঙ্গে মিলে ছেলে তুহিনকে জবাই করেন বাছির। জবাই করেই থেমে থাকেন নি, হত্যার পর তুহিনের কান ও লিঙ্গ কেটে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এরপর দু’টি ছুরিতে গ্রামের প্রতিপক্ষের দুই জনের নাম লিখে তুহিনের পেটে গেঁথে দেওয়া হয়।’
পূর্ব বিরোধকে কেন্দ্র করে গ্রামের প্রতিপক্ষ সালাতুল মিয়া ও সুলেমান মিয়া ফাঁসাতে ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর রোজ রবিবার গভীর রাতে নিজের পাঁচ বছরের শিশু তুহিন মিয়াকে নৃশংস, নিমর্ম কায়দায় খুন করেছিল সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কেজাউরা গ্রামের আবদুল বাছির। এমন অপরাধের সঙ্গী ছিল তার ভাই ও ভাতিজা।
শিশু তুহিন মিয়া হত্যা মামলায় ৫ মাসের মাথায় বাবা আব্দুল বাছির (৪৭) ও চাচা নাছির উদ্দিন (৪২) কে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আদালত। অপর দুই আসামী চাচা আব্দুল মোছাব্বির (৫২)ও জমশেদ আলী (৬৭) কে বেকসুর খালাস প্রদান করেছিলেন আদালত।
২০২০ সালের ১৬ মার্চ সোমবার সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় প্রদান করেছিলেন। কিন্ত গত সাড়ে ৬ বছরের আদালতের রায় বাস্তবায়ন হয়নি।
সন্তান হারানোর সাতটি বছর পেরিয়ে গেছে মা মনিরা বেগমের। কিন্তু, তুহিনের মা মনিরা বেগমের কাছে সেই রাত যেন এখনো শেষ হয়নি। রায় ঘোষণার পর কেটে গেছে সাড়ে ছয় বছর। নিম্ন আদালতে দেওয়া সেই মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো ঝুঁলে আছে হাইকোর্টের আপিল বিভাগে। দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল বাছির ও তার ভাই নাছির উদ্দিন কারাগারে আটক আছেন।
সুনামগঞ্জ শিশু আদালতের তৎকালীন পি.পি অ্যাড. নান্টু রায় বলেন, আলোচিত শিশু তুহিন মামলায় দ্রুততম সময়ে বিচার শেষ করে রায় দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে মামলাটি হাইকোর্টের আপিল বিভাগেই রয়েছে। সেখান থেকে এখনো রায় হয়নি। তুহিনের মায়ের সঙ্গেও আমার দীর্ঘদিন কোন যোগাযোগ নেই, সেজন্য বুঝা যায় নিম্ন আদালতের রায়ই এখনো বহাল রয়েছে।’
শিশু তুহিনের মা মনিরা বেগম বলেন, ঘটনার সাত বছর হয়ে গেল, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় ঘটনাটা যেন সেদিনের। ওই রাতে আমার ছেলে তার বাবার পাশে ঘুমিয়েছিল। সকালে তার ক্ষতি-বিক্ষত লাশ গাছের সঙ্গে ঝুলতে দেখি। মা হিসেবে ওই দৃশ্য আমি সারা জীবনেও ভুলতে পারব না। তুহিন কারো শত্রু ছিল না, সে ছিল ছোট্ট শিশু। তাকে কেন এভাবে মেরে ফেলতে হলো, তুহিনের কষ্ট সারা জীবন বয়ে বেড়াব।’
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের আদালত রায় দিয়েছেন, আসামিদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। কিন্তু এত বছর পরও সেই সাজা কার্যকর হয়নি। আমি চাই, আইনের নিয়ম মেনে দ্রুত এই মামলার শেষ হোক। আমার ছেলে আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার হত্যার বিচারটা যেন শেষ পর্যন্ত দেখতে পারি এটাই আমার চাওয়া।’
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের গত ১৩ অক্টোবর সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কেজাউরা গ্রামে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল শিশু তুহিন মিয়াকে। ১৪ অক্টোবর সোমবার সকালে বাড়ির পাশের একটি গাছ থেকে ওই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশু তুহিনের কান, গলা ও লিঙ্গ কেটে পাশবিক কায়দায় হত্যা করে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। তুহিনের পেটে বিদ্ধ ছিল দুটি ধারালো ছুরি। এঘটনায় ১৪ অক্টোবর দিরাই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তার মা মনিরা বেগম।
মনিরা বেগমের দায়ের করা মামলায় ওই বছরের ১৫ অক্টোবর মঙ্গলবার তুহিনের বাবা আবদুল বাছির, তিন চাচা আবদুল মছব্বির, জমসেদ আলী ও নাসির মিয়া এবং চাচাতো ভাই শাহরিয়ারকে প্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ। ওই দিনই আদালতের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তুহিনের চাচা নাসির মিয়া ও চাচাতো ভাই মো. শাহরিয়ার। এরপর ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর শিশু তুহিন মিয়া হত্যার ঘটনায় পুলিশ তুহিনের বাবা, তিন চাচা ও এক চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল এবং ২০২০ সালের ১৬ মার্চ সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার শিশু তুহিনের বাবা আব্দুল বাছির ও চাচা নাছির উদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন।