২ মে ২০২৬, ১১:১৭ এ.এম

হাওর খেকুদের খোলা চিঠি

হাওর খেকুদের খোলা চিঠি

 

মোহাম্মদ সেকুল ইসলাম

 হাওরের আত্মচিৎকার 
"আমি হাওর। সুনামগঞ্জের বুক।  
বৈশাখে আমি যুবক, কার্তিকে আমি বুড়া।  
আমার জলে মাছ খেলত, পাড়ে ধান হাসত।  
নৌকার ছলাৎ ছলাৎ ছিল আমার গান।  
হাসন রাজা আমার পাড়ে বইসা গান লিখত -  
‘লোকে বলে বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার’।  

আজ আমার ঘরবাড়ি আসলেই ভালা নাই।  
কারণ তোমরা আসছো - দালাল আর ভূমিখেকো।"

 দালালের ফর্দ
"দালাল ভাই, তোমার ফাইল ভর্তি স্ট্যাম্প,  
সাইনবোর্ডে লেখা ‘জমি কিনুন, স্বপ্ন গড়ুন’।  
কিন্তু কার জমি? কার স্বপ্ন?  
গরিব কৃষকেরে বুঝাও - ‘এইটা খাস জমি,  
সরকার নিব, তার আগে বেইচা দাও’।  
দুই লাখে ১০ লাখের জমি কিনো,  
পরের দিনই ৫০ লাখে বেচো কোম্পানিরে।  
রাতে তুমি এসির নিচে ঘুমাও,  
আর কৃষক ঘুমায় খোলা আকাশের নিচে।  
কারণ তার ভিটা এখন তোমার প্রজেক্ট।"

ভূমিখেকোর বুলডোজার
"আর তুমি ভূমিখেকো, তোমার নাম শিল্পপতি।  
তুমি আসো ঢাকা থেইকা, হেলিকপ্টারে নামো।  
ম্যাপ খুলো, লাল কালি দিয়া দাগ দাও -  
‘এইখানে রিসোর্ট হবে, এইখানে ইন্ডাস্ট্রি’।  
বুলডোজার চলে, আমার বুক চিরে রাস্তা হয়।  
জলাভূমি ভরাট করো, পাখির বাসা ভাঙো।  
বর্ষায় পানি কই যাবে?  
গরিবের উঠানে, গরিবের কবরে।  
তুমি বলো ‘উন্নয়ন’,  
আমি বলি ‘কবর খোঁড়া’।"

জরিনার কান্না
"মনে আছে জরিনা বেওয়ার কথা?  
১২ শতক ভিটা ছিল তার। সাত জনমের স্মৃতি।  
তোমরা নোটিশ দিলা - ‘সরকারি প্রজেক্ট’।  
দুই লাখ টাকা ধরায়া দিয়া ভিটা খাইলা।  
আজ ওইখানে তোমার রিসোর্টের সুইমিং পুল।  
জরিনা এখন বস্তিতে, আম গাছটার শোকে মরে।  
তার কান্না শুনো? না, এসির শব্দে শোনো না।  
হাওরের প্রতিটা ঢেউ এখন জরিনার দীর্ঘশ্বাস।"

মাছের কবর
"আগে আমার বুকে বোয়াল, রুই, কাতলা নাচত।  
জেলের জালে উঠত সংসারের হাসি।  
এখন তোমার ফ্যাক্টরির বর্জ্য পড়ে আমার জলে।  
পানি কালো, মাছ মরে ভাইসা উঠে।  
জেলে জাল ফালায়, উঠে পলিথিন আর বোতল।  
তুমি টিভিতে অ্যাড দাও - ‘পরিবেশবান্ধব প্রকল্প’।  
আমার লাশের উপর দাঁড়ায়া তুমি সবুজের গল্প কও।  
বাহ! কী চমৎকার অভিনয়।"

শেষ কথা, শেষ হুঁশিয়ারি 
"দালাল ভাই, ভূমিখেকো সাব,  
টাকা অনেক কামাইছো, ব্যাংক ভরছো।  
কিন্তু মনে রাইখো -  
হাওর মরলে সুনামগঞ্জ মরে,  
সুনামগঞ্জ মরলে বাংলাদেশের ফুসফুস মরে।  
যেদিন হাওর পুরা ভরাট হইব,  
সেদিন বর্ষার পানি ঢাকা ডুবাইব।  
তোমার গুলশানের ফ্ল্যাটও বাঁচব না।  

প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না,  
প্রকৃতি শুধু হিসাব বুঝায়া দেয়।  
বুলডোজারের দাগ মুছা যায়,  
কিন্তু হাওরের অভিশাপ?  
সাত পুরুষেও কাটে না।

এখনো সময় আছে।  
দালালি ছাড়ো, জমি খাওয়া বন্ধ করো।  
হাওর বাঁচলে তুমিও বাঁচবা,  
তোমার নাতিও মাছ ভাত খাইতে পারব।  
নাইলে একদিন তোমার নাতি গুগলে সার্চ দিব -  
‘হাওর কী ছিল?’  
উত্তর আসব - ‘একটা জলাভূমি, যা মানুষ খাইয়া ফেলছে’।"