৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৪ পি.এম

আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া মারছে

আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া মারছে

আমার বাপরে মারিলিছে (মেরে ফেলা), আমার আব্বু সবসময় মাততা চাইতা আমার লগে। তারা আমারে ফোন দিতানা এর লাগি আমার আব্বুর লগে মাততাম পারছি না। আমার আব্বু ঢাকাত থাকতে মাতছিলাম, আমার আব্বু কইলছিলা দেশে আওয়ার সময় আমার লাগি রং আনবা (আনা), কিন্তু আরও আনতা পার্ররানা। আমার আব্বু দুইন্নাই (দুনিয়া) ছাইড়া গেছইনগি। আমার বাপরে যারা মারছে আমি চাই তারা জেলে যাইত।‘
এভাবেই বাবার মৃত্যুর ঘটনায় বিচারের আকুঁতি ও বাবার সাথে শেষ কথা বলার স্মৃতি জানিয়েছিলো লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাবার পথে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া অভিবাসন প্রত্যাশী সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমানের ৫ বছর বয়সী শিশু কন্যা আনজুম মাহার।
জানা যায়,  লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার ১২ তরুণের স্বজনদের চোখে এখন শুধু কান্না। তাঁদের মধ্যে জগন্নাথপুরে আমিনুর রহমানের একমাত্র শিশু সন্তান আনজুম মাহারের আকুঁতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। আনজুমের আকুঁিত সবার হৃদয়ে নাড়িয়ে দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বাবাকে হারানো নিয়ে আনজুম মাহার বলছে, আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া মারছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জের প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হাবিবুর রহমানের চার ছেলে। দুই ছেলে সরকারি চাকুরি করেন। এক ছেলে যুক্ত্যরাজ্যে (লন্ডন) থাকেন। আমিনুর রহমান চার ভাইয়ের তৃতীয় ছিলেন। তিনি দেশে ডিলার ব্যবসা করতেন। এলাকার যুবকরা দলবেধে ইউরোপে যাচ্ছে দেখে তিনিও ইউরোপে যেতে আগ্রহী হন। কিন্ত তার বাবা অন্য ভাইরা তাকে দালালের মাধ্যমে যেতে নিষেধ করেন। বৈধভাবে ইউরোপে পাঠানোর জন্য তাকে কয়েকটি দেশে ভ্রমণ করানো হয়। আমিনুর রহমান পৃথকভাবে জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে বসবাস করতেন। বাবা ও ভাইয়ের নিষেধ অমান্য করে হটাত করে তিনি ইউরোপের যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন। ভাইরা একদিন জানতে পারেন গ্রিসে যাওয়ার জন্য তিনি লিবিয়া পৌঁছেছেন। এরপর গত ঈদের দিন লিবিয়া থেকে বাবার সাথে কথা বলেন আমিনুর রহমান। এরপর বাবা বা ভাইয়ের সাথে আর কোন কথা হয়নি। এক পর্যায়ে গত ২৭ মার্চ অন্য ভাই ও মা-বাবা তার মৃত্যুর খবর পান। আমিনুর রহমানের মৃত্যুর পর শিশু আনজুম ও তার মা মুসলিমা বেগম টিয়ারগাঁও গ্রামে মুসলিমা বেগমের মামার বাড়িতে আছেন। আনজুম জগন্নাথপুর পৌর শহরের নার্সারি স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানের শিক্ষার্থী।
আনজুমের বড় চাচা মিজাজুর রহমান বলেন, আমাদের এলাকার অনেক মানুষ সাগরপথে ইউরোপ চলে গেছেন। একেক পরিবারের ৪-৫ জন করেও গেছেন। এসব দেখে আমার ভাই আগ্রহী হলে সচেতন মানুষ হিসেব আমরা তাকে নিষেধ করি। কিন্তু সে আমাদেরকে না জানিয়ে লিবিয়া চলে যায়। আমিনুরের এমন মৃত্যুতে তার স্ত্রী মানসিক ও শারিরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমার বৃদ্ধ বাবাও অনেক আঘাত পেয়েছেন। ফুলের মত আমার ভাতিজি আনজুমের মুখের দিকে চাওয়া যায় না। কি সান্ত¡না দেব তাকে ও তার মাকে। আমরা চাই দালালদের শাস্তি হোক এবং এভাবে প্রবাস যাত্রা বন্ধ হোক।
আমিনুর রহমানের বাবা শিশু আনজুমের দাদা হাবিবুর রহমান ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, পিতা-মাতার জীবদ্দশায় সন্তানের মৃত্যু যে কত কষ্টকর যারা সন্তান হারিয়েছেন তারাই কেবল বুঝেন। আমাদের এমন কোন সংকট ছিল না যে, ছেলে প্রবাসে গিয়ে উন্নতি করবে। বৃদ্ধ বয়সে ছেলে হারানোর বেদনা সহ্য করতে পারছি না। আমি থানায় মামলা করেছি মানবপাচারকারীদের যেন উপযুক্ত বিচার হয় এবং ন্যায় বিচার চাই। ’
মামলার বিষয়ে জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া আমিনুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবার দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করার জন্য সিআইডি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এখন তারাই মামলাটির তদন্ত করবেন, হয়ত আগামী সপ্তাহ থেকে তারা কাজ শুরু করবেন।‘
প্রসঙ্গত, গেল ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাবার পথে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মারা যান অভিবাসন প্রত্যাশী সুনামগঞ্জের ১২ যুবক। লিবিয়া থেকে অবৈধ পথে গ্রীস যাবার পথে সাগরে তাদের মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটের কারণে ভূমধ্যসাগরে পাচারের বোটেই তারা প্রাণ হারান। পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
মারা যাওয়া যুবকরা হলেন, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০), জগদল ইউনিয়নের বাসুরী গ্রামের সালিকুর রহমানের ছেলে সুহানুর রহমান এহিয়া (২২), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. তায়েফ মিয়া (২৪)।
জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁও গ্রামের আশিক মিয়ার ছেলে শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২৩), ছিলাউড়া গ্রামের সামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক (২২) ও দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম আহমদ (২৪) ও দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামের ফয়েজুর রহমানের ছেলে মো. ফাহিম অভ্র (২০)।
যুবকদের মৃত্যুর ঘটনায় ৯ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে মানবপাচার ও অনাহারের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে দিরাই ও জগন্নাথপুর থানায় পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। ৩০ মার্চ সোমবার রাতে জগন্নাথপুর থানায় ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন, আমিনুর রহমানের বাবা হাবিবুর রহমান। দিরাই থানায় ৪ মানব পাচারকারীর নামোল্লোখ করে মামলা করেছেন দিরাইয়ের বাসুরি গ্রামের মারা যাওয়া সোহানুর রহমান এহিয়ার বাবা ছালিকুর রহমান।