দীর্ঘ চার বছর ধরে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ধাক্কা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। ওই যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ঘূর্ণাবর্ত একসময় বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির অর্থনীতিতে পরিণত করেছিল। সেই সংকট পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই নতুন করে আরেকটি ভূরাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত এরই মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে বড় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতির নতুন এক ঝড় তৈরি করতে পারে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থায়। আন্তর্জাতিক শিপিং থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ ট্রাক পরিবহন- সব ক্ষেত্রেই পণ্য পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। এমন অবস্থায় রপ্তানি চাহিদা কমার মধ্যে সাধারণ মানুষের ওপর নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শিপিং কোম্পানিগুলো এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে বড় অঙ্কের ‘বাঙ্কার সারচার্জ’ (জ্বালানি খরচ বাবদ অতিরিক্ত ফি) আরোপ করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে কনটেইনারপ্রতি বাঙ্কার সারচার্জ ছিল ৭০০ থেকে ৭৫০ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ডলারে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বাবদ অতিরিক্ত খরচ। চাপ শুধু আন্তর্জাতিক শিপিংয়েই সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের অভ্যন্তরেও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে গেছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরগামী একটি কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে আমদানিপণ্য খালাসকারী লাইটারেজ জাহাজগুলোকেও প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন ট্রাক মালিকরাও। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যার শেষ প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারী যানবাহনের জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিজেলের তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে পরিবহন খরচ দ্রুত বাড়ছে এবং তার প্রভাব বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে শিল্পপণ্য থেকে শুরু করে নির্মাণ সামগ্রী- সব ধরনের পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে পচনশীল পণ্যের পরিবহনে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক ট্রাক রাস্তা থেকে তুলে নেওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকা অভিমুখে শাকসবজি, মাছ ও পোলট্রিসহ নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
পণ্য দেরিতে পৌঁছালে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় ব্যবসায়ীরা বেশি ভাড়ায় ট্রাক ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন ব্যয়ের এই আকস্মিক বৃদ্ধি রাজধানীর কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
মহাসড়কে নিত্যপণ্যবাহী ট্রাকচালকরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। জানা গেছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের রেশনিং ব্যবস্থা জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। এতে যানবাহন মালিকদের মধ্যে আতঙ্কে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ জ্বালানি ও সারের বড় অংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে- পরিবহন ব্যয় বাড়ে, বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, সেচ ও সারের ব্যয় বাড়ে, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত এই চাপ গিয়ে পড়ে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বৈশ্বিক তেলের বাজারের ধাক্কা নীরবে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এর আগেও বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম তীব্রভাবে বেড়ে যায়। তখন দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায় এবং কয়েক বছর ধরে তা উচ্চ অবস্থানে ছিল।
বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তখনকার চেয়েও বেশি ভঙ্গুর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। টাকার ওপর চাপও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকা। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তা ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২২ দশমিক ৫ টাকায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে টাকার অবমূল্যায়ন আরও ত্বরান্বিত হতে পারে। এতে আমদানি বিল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ দ্রুত বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান এমএ রাজ্জাক বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রেশনিং পদ্ধতি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এটিকে পুঁজি করে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তাই নিত্যপণ্য পরিবহনে জ্বালানি সরবরাহে বিশেষ ছাড় দেওয়া যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই কঠোর তদারকির আওতায় রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রাখা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা উচিত।
সূত্র:আমাদের সময়