গত বছরের ৮ নভেম্বর রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় একটি অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযানে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা উদ্ধার এবং দুজনকে আটক করার কথা বলা হয়। কিন্তু আসলে অভিযানটি ছিল সাজানো নাটক।
প্রকৃতপক্ষে ওইদিন সেখানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ এক ব্যবসায়ীর নগদ পৌনে চার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে ‘জাল টাকার অভিযানে’র মামলাটি পুনরায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পাশাপাশি, পুলিশ অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু করে। এসব তদন্ত কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযানের নামে টাকা লোপাটের বিষয়টি সত্য।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ, তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, পুলিশের সোর্সের জবানবন্দি এবং পুলিশের বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে এবং ঢাকা পোস্টের নিজস্ব অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে। ঢাকা পোস্টের হাতে এসেছে পুলিশের সোর্সের ভিডিও বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আরও কিছু আলামত।
ঘটনার শুরু যেভাবে
ঢাকা পোস্টের হাতে আসা যাবতীয় তথ্য ও আলামত বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এ ঘটনার শুরু হয়েছে গত বছরের (২০২৫) ৭ নভেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বাসিন্দা পুলিশের সোর্স দিদারুল আলমের মাধ্যমে। তিনি ঢাকায় তার পরিচিত নিজাম উদ্দিন নামে পুলিশের এক এসআইকে প্রথমে জানান, ঢাকার ওয়ারীতে ক্যাসিনোর ৫ কোটি টাকা লুকিয়ে রাখা আছে। আপনারা অভিযান চালাবেন কি না। এসআই নিজাম উদ্দিন তা এড়িয়ে যান। এরপর দিদারুল ৭ নভেম্বর চট্টগ্রামে কর্মরত তার পরিচিত এএসআই জাহিদকে বিষয়টি জানান। জাহিদ বিষয়টি জানান ঢাকার তেজগাঁওয়ে ডিবি পুলিশের এএসআই সুস্ময় শর্মাকে। এরপর সুস্ময় শর্মা একই দিন ডিবির তেজগাঁওয়ের সহকারী কমিশনার তারেক সেকান্দারকে (বর্তমানে রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) বিষয়টি অবহিত করেন। তারেক সেকান্দার সিদ্ধান্ত নেন অভিযান পরিচালিত হবে পরদিন ৮ নভেম্বর। সোর্স দিদারুল ও তার দুই সহযোগীকে কক্সবাজার থেকে ঢাকায় আসতে বলা হয়।
মাস্টারমাইন্ড তারেকের ভিন্ন পরিকল্পনা ও ‘কথিত’ জাল টাকার অভিযান
বিপুল পরিমাণ টাকার খোঁজ পেয়ে ঢাকা মহানগর ডিবির তেজগাঁও বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার তারেক সেকান্দার মনে মনে ভিন্ন পরিকল্পনা আঁটেন। তিনি ওই টাকা কীভাবে লোপাট করা যায় সেই চিন্তা শুরু করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি প্রথমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে (ডিসি তেজগাঁও) জানান, ওয়ারীতে একটি বাসায় ছাত্রলীগের ৪ সদস্য লুকিয়ে আছে। সেখানে অভিযান পরিচালনা করতে চান তিনি। ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ তাকে অনুমতি দেন।
অনুমতি পেয়েই নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অভিযান শুরুর প্রস্তুতি শুরু করেন তারেক সেকান্দার। তার নেতৃত্বে গঠন করেন ১৩ জনের আভিযানিক টিম।
সোর্স দিদারুলের দেওয়া জবানবন্দির বর্ণনা অনুযায়ী, ওইদিন (৮ নভেম্বর) রাত ১০টার দিকে তারা ডিবি অফিসের গেইটে যান। সেখানে একটি মাইক্রোবাস দাঁড় করানো ছিল। এএসআই সুম্ময় শর্মা তাদেরকে এসি তারেক সেকান্দারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং গাড়িতে উঠতে বলেন। দিদারুল ও তার সহযোগী আইয়ুব ও জোবায়ের গাড়িতে উঠে অভিযানে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের দেখতে পান। এরপর গাড়িটি ওয়ারীর সেই বাসার নিচে যায়। বাসাটি ওয়ারীর জুড়িয়াটুলির ৩৮ নম্বর ভবনের ৭ম তলায় অবস্থিত।
বাসার কাছাকাছি গাড়িটি রেখে রাত ১১টার দিকে সোর্স আইয়ুব ও জোবায়েরকে বাসার নিচে রেখে সোর্স দিদারুলকে নিয়ে এসি তারেক সেকান্দারের নেতৃত্বে ওই ভবনের ৬ তলায় যায় ডিবির টিম। ৬ তলার দরজায় নক করলে ভেতর থেকে একজন দরজা খুলে তাদের পরিচয় জানতে চান। এসি তারেক সেকান্দার ও এসআই মিশন বিশ্বাস লোকটিকে জানান, এই বাসায় ১৩ বছরের একটি মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে এসে একজন অবস্থান করছে। তারা বাসা তল্লাশি করবেন। লোকটি জানান, যে ব্যক্তির নাম বলা হয়েছে তিনি সম্ভবত ৭ম তলায় থাকেন। তখন তারা সবাই ৭ম তলায় গিয়ে দরজায় নক করেন এবং একই কৌশল অর্থাৎ ১৩ বছরের কিশোরীকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযান চালাতে চান।
রাত সাড়ে ১১টার দকে তারা ওই বাসায় প্রবেশ করেন। বাসায় তখন দুই যুবক ছিলেন। তাদের একটি কক্ষে আটক করা হয়। এসি তারেক সেকান্দারের নেতৃত্বে তল্লাশির এক পর্যায়ে ডিবি পুলিশ সেখানকার একটি কক্ষে স্টিলের ক্যাবিনেটের ৭টি ড্রয়ারে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা (আসল) খুঁজে পায়। সবগুলো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের বান্ডিল।
এরপর ওই কক্ষের লাইট বন্ধ করে এসি তারেক সেকান্দার, এসআই মিশন, এএসআই সুস্ময় টাকাগুলো বের করে ৭-৮ টি ব্যাগে ভরেন। সোর্স দিদারুল সামনে এগিয়ে টাকাগুলো দেখেন, তার ধারণা সেখানে প্রায় ৪/৫ কোটি টাকা হবে। এ সময় এসআই মিশন বিশ্বাস দিদারুলকে ধমক দিয়ে পাশের সোফায় বসিয়ে রাখেন। টাকাগুলো ব্যাগে ভরা হলে এসি তারেক সেকান্দার ডিবি পুলিশের কয়েকজন সদস্যকে দিয়ে টাকাভর্তি ব্যাগগুলো নিচে রাখা তাদের গাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
কিছুক্ষণ পর তারা আবার উপরে এলে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং এসি তারেক সেকান্দার, এসআই মিশন বিশ্বাস ও রফিক আগে থেকে ব্যাগে করে নিয়ে আসা অনেকগুলো জাল টাকা ক্যাবিনেটে রাখেন। এরপর পাশের বাসার কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে এসে সাক্ষীদের সামনে পুনরায় ওই বাসা তল্লাশি শুরু করেন তারা! কিছুক্ষণের মধ্যে সবাইকে দেখানো হয়- এখানে ৫-৬ লাখ জাল টাকা পাওয়া গেছে। আর পাওয়া গেছে ১০-১৫ লাখ নগদ টাকা।
এরপর এসি তারেক সেকান্দার একই গল্প ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন করে জানান এবং জাল টাকা ও আটককৃতদের ভিডিও রেকর্ড করেন।
অভিযান শেষে আটক দুই যুবককে গাড়িতে উঠিয়ে এএসআই সুস্ময় শর্মা এসি তারেক সেকান্দারের কাছ থেকে নিয়ে সোর্স দিদারুলকে ২ হাজার টাকা দেন এবং তাদের ওই মুহূর্তে চলে যেতে বলেন। তাদের বলা হয় পরবর্তীতে আবার যোগাযোগ করা হবে।
ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে ভিন্ন তথ্য প্রদান এবং জাল টাকার মামলা
অভিযান শেষে রাত ১২টা ৪৯ মিনিটে এসি তারেক সেকান্দার ডিবি তেজগাঁওয়ের ডিসি রাকিব খানকে ফোন করে জানান, জাল টাকা চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। যদিও অভিযানের আগে তিনি বলেছিলেন ছাত্রলীগ কর্মী ধরতে গিয়েছিলেন। এতে ডিসি রাকিব বিস্মিত হন। তারপরও বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় তিনি ডিবির ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের জানান।
এরপর অভিযানে থাকা এসআই সাইদুজ্জামানকে দিয়ে ৯ নভেম্বর ওয়ারী থানায় মামলা দায়ের করান এসি তারেক।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘‘৮ নভেম্বর রাত সাড়ে এগারোটার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ জানতে পারে ওয়ারীর জুড়িয়াটুলির আটত্রিশ নম্বর বাসার সপ্তম তলার পূর্ব পাশে সাজেদা বেগমের ভাড়া বাসার ভিতরে দুইজন লোক জাল টাকা নিয়ে অবস্থান করছে। উক্ত সংবাদটি টিম লিডারের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। এরপর টিম লিডার সহকারী পুলিশ কমিশনার মো তারেক সেকান্দার, এসআই মিশন বিশ্বাস, এসআই এএসএম সাইদুজ্জামান, এএসআই সুস্ময় শর্মা, এএসআই রফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাইফুল ইসলাম কনস্টেবল পারভেজ কনস্টেবল সালমান রহমানসহ রাত ১১টা ৫০ মিনিটে ওই বাসায় প্রবেশ করে। পুলিশের উপস্থিতির বুঝতে পেরে পালানোর চেষ্টা করলে নুরুল হক (৩২) ও সাইদুল আমিন (২৪) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ১ হাজার টাকা মূল্যের ৬ শটি কথিত জাল টাকার নোট ও আসল ১ হাজার টাকার ৯০০টি, ৫০০ টাকার ২০০০টি, ও ২০০ টাকার ২০০টি এবং ১০০ টাকার ৩০০টিসহ মোট ১৯ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা এবং টাকা গোনার মেশিন উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জাল টাকার নোট সম্পর্কে সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেনি। এই ঘটনায় আরও জানা যায়, তাদের অপর সহযোগী মো. খাইরুল ইসলাম (৪২) জাল টাকা ক্রয় বিক্রয় ব্যবসায়ীদের নিকট হইতে জাল টাকা দিয়া মালামাল ক্রয় করত। গ্রেপ্তারকৃত ২ জন রোহিঙ্গা বলে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে জানায়। অভিযানে আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ শাওন ও কনস্টেবল সাইফুল সাক্ষী ছিলেন। আসামিদের দেখানো মতে তাদের স্বয়ং কক্ষ হইতে একটি কালো রঙের ট্রাভেলব্যাগ এর ভিতর থেকে টাকা উদ্ধার করা হয়।’’
অভিযান শেষে যেভাবে সরানো হয় ‘পৌনে চার কোটি’ টাকা
অভিযান শেষে এসি তারেক সেকান্দার অভিযান টিমের সাথে ডিবি কম্পাউন্ডে প্রবেশ না করে তার ব্যবহৃত সরকারি গাড়ির ড্রাইভার কনস্টেবল লিপন চন্দ্র রায়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাড়িসহ ডেকে নিয়ে যান এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে অভিযান টিমের গাড়ি ও এসি তারেক সেকান্দারের ব্যক্তিগত ব্যবহৃত সরকারি গাড়ি একত্রে মিলিত হয় (সিসিটিভি ফুটেজ আছে)। অভিযান টিমের গাড়ি থামিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে আসামি দুজনকে গাড়ি থেকে নিচে নামিয়ে একটু দূরে অন্ধকারে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ফাঁকে অভিযান টিমের গাড়ি থেকে উদ্ধারকৃত টাকার ব্যাগগুলো থেকে বেশ কয়েকটা ব্যাগ তারেক সেকান্দারের সরকারি গাড়িতে তোলা হয় এবং এরপর সেই গাড়ি অন্যত্র চলে যায়। পরে এসি তারেক সেকান্দার ওই গাড়িতেই ডিবি কম্পাউন্ডে প্রবেশ করেন।
টাকার ভাগ দেওয়া হয় সোর্সদের
ঘটনার পরদিন গত বছরের ৯ নভেম্বর সকালে এএসআই সুস্ময় শর্মা সোর্স দিদারুলকে জানান তারা যেন ডিবি অফিসের সামনে না আসেন। এএসআই সুষ্ময়-ই বিকালে তাদের সঙ্গে মালিবাগে দেখা করবেন। সোর্সরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত মালিবাগে অপেক্ষা করেন, কিন্তু কেউ আসেননি। এরপর সোর্স দিদারুল চট্টগ্রাম ডিবিতে কর্মরত এএসআই জাহিদকে (যে ঢাকায় রেফারেন্স পাঠিয়েছিল) ফোন দেন। জাহিদ তাদের জানান, যেখানে আছেন সেখানেই যেন থাকেন। তিনি কিছুক্ষণ পর বিমান যোগে ঢাকায় আসবেন এবং তাদের সঙ্গে দেখা করবেন।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে এএসআই জাহিদ সোর্স দিদারুলকে ফোন করে সিএনজি নিয়ে ফার্মগেট মণিপুরী পাড়ায় যেতে বলেন। তারা সেখানে যান এবং অভিযানে থাকা এএসআই সুম্ময়, এসআই মিশন ও এএসআই জাহিদসহ অন্য একজন পুলিশ অফিসারকে দেখতে পান। পুলিশ স;স্য ও কর্মকর্তারা কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বলেন । এরপর এএসআই সুস্ময় ও এসআই মিশন টাকা ভর্তি একটি ব্যাগ এএসআই জাহিদকে বুঝিয়ে দেন।
এর কিছুক্ষণ পর এএসআই জাহিদ সোর্সদের মিরপুর-১০ নম্বর গোল চক্করে যেতে বলেন, তিনিও সেখানে যাচ্ছেন বলে জানান। সোর্সরা সিএনজি যোগে মিরপুর-১০ গোল চক্করে এএসআই জাহিদের সাথে দেখা করেন। তখন সেখানে এএসআই জাহিদের পরিচিত একটি প্রাইভেটকার আসে। এএসআই জাহিদ টাকা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে ওঠেন এবং সোর্সদেরও উঠতে বলেন।
গাড়িতে বসে এএসআই জাহিদ সোর্স আইয়ুবকে নগদ ২৭ লাখ টাকা, সোর্স জোবায়েরকে নগদ ৫ লাখ টাকা দেন। সোর্স দিদারুলকে পরে ১১ লাখ টাকা দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এ সময় এএসআই জাহিদ সোর্স দিদারকে জানান, এসি তারেক সেকান্দার এ অভিযানের ঘটনায় সোর্স মানি হিসেবে আপাতত ৫৯ লাখ টাকা দিয়েছেন। পরে আরো দেবেন বলেছেন।
ডিবির কাছে ভিন্ন তথ্য, অভিযান নিয়ে সন্দেহ
এ ঘটনার ৬-৭ দিন পর বিভিন্ন মাধ্যমে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতে পারেন, ওয়ারীর ওই অভিযানের বিষয়ে কিছু তথ্য গোপন করা হয়েছে এবং পুরো অভিযান নিয়ে বেশকিছু গরমিল রয়েছে।
বিষয়টি আমলে নিয়ে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযানে নেতৃত্বদানকারী এসি তারেক সেকান্দারকে ডেকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিনি এজাহারে যা উল্লেখ আছে সেটাই সঠিক হলে জানান।
এরপর ডিবির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযানে যাওয়া প্রত্যেককে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তারাও প্রত্যেকে একইভাবে এজাহারের অনুরূপ বক্তব্য প্রদান করেন।
সন্দেহের পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন
এ ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে গত বছরের ১৬ নভেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিশন বিশ্বাসকে পরিবর্তন করে নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে ডিবি তেজগাঁও বিভাগের এসআই মো. জাহাঙ্গীর আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. জাহাঙ্গীর আলম কথিত জাল টাকাসহ আটক হওয়া আসামিদের গত বছরের ২৪ নভেম্বর ৩ দিনের পুলিশ রিমান্ডে এনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্মুখে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন অভিযান সম্পর্কে তথ্যের ব্যাপক গরমিল পাওয়া যায়। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা ডিবি তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার রাকিব খানকে বিষয়টি সম্পর্কে আরও নিবিড়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে বলেন। এরপর ঘটনাস্থল ও আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা যায়
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ডিবির পুরো আভিযানিক টিম ওইদিন রাত ১১টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌছায়। রাত ১২টা ৩২ মিনিটে দেখা যায় এক ব্যক্তি কাঁধে একটি ভারী ব্যাগ এবং হাতে আরেকটি ভারী ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে দ্রুত রাস্তার দিকে চলে যান। আবার রাত ১২টা ৩৯ মিনিটে এক ব্যক্তি কাঁধে একটি ভারী ব্যাগ এবং হাতে আরেকটি ভারী ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে দ্রুত রাস্তার দিকে চলে যান। সর্বশেষ রাত ১টা ২০ মিনিটে অভিযান শেষ করে সবাই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন- এটি দেখা যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব ফুটেজ এবং তথ্যের গরমিল পাওয়ার পরেও জিজ্ঞাসাবাদে এসি তারেক সেকান্দার এবং অভিযান টিমের কোনো সদস্য সন্তোষজনক জবাব দেননি।
বিপদ টের পেয়ে সোর্সকে মোবাইল বন্ধ করে পালিয়ে যেতে বলা হয়
ঘটনার এক সপ্তাহ পর অভিযানে থাকা এএসআই সুস্ময় শর্মা সোর্স দিদারুলকে ফোন দেন এবং বলেন তার সিম ফেলে দিয়ে মোবাইল বন্ধ করে যেন পালিয়ে থাকেন। যেকোন সময় পুলিশের স্পেশাল টিম তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে।
দিদারুল তা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন ‘আমি তো কোনো চুরি-ডাকাতি করিনি। আমি সোর্সের কাজ করি। আমি কাজ দিয়েছি আপনারা করেছেন। এটা যদি আইনের বাইরে করে থাকেন সেটার জন্য আমি দায়ী নই। দায়ী আপনারা।
এরপর এএসআই সুস্ময় শর্মা এবং এসআই মিশন বিশ্বাস দিদারুলকে ৮ লক্ষ টাকা নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেন। দিদারুল বাড়ির কাউকে কিছু না বলে গত বছরের ৩০ নভেম্বর ঢাকায় আসেন। ওঠেন কাওরান বাজারের একটি হোটেলে।
এরপর এএসআই সুস্ময় শর্মা ও এসআই মিশন বিশ্বাস এসি তারেক সেকান্দারের পরামর্শে সোর্স দিদারুলের পরিবারকে ফোনে ভয়ভীতি দেখান। তারা দিদারুলের স্ত্রী মমতাজ বেগমকে বাদী করে কক্সবাজার জেলার উখিয়া থানায় ১ ডিসেম্বর জিডি করান ( জিডি নং-৬২)। সেখানে উল্লেখ করা হয় দিদারুলকে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া একই দিন (১ ডিসেম্বর) মধ্যরাতে দিদারুলকে হোটেল থেকে তুলে নেওয়ার জন্য কে বা কাহারা চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি সুকৌশলে হোটেল থেকে পালিয়ে যান এবং পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন।
দিদারুলের ছেলে ও ভাইকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঢাকায় আনেন এসি তারেক
গত বছরের ১ ডিসেম্বর রাতে এএসআই সুস্ময় শর্মা সোর্স দিদারুলের ছেলে মো. সাজ্জাদ ও স্ত্রী মমতাজ বেগমকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঢাকায় আসতে বলের। ভয় পেয়ে দিদারুলের ছেলে সাজ্জাদ ও দিদারুলের ভাই রফিক ঢাকায় আসেন। তাদের বলা হয়, যাত্রাবাড়ী এসে ফোন দিলে একজন সিনিয়র অফিসার তাদের রিসিভ করবেন। ২ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় যাত্রাবাড়ী পৌঁছে এএসআই সুস্ময়কে ফোন দিলে সেখানে এসি তারেক সেকান্দার ও আরেকজন ব্যক্তি (মুখে মাস্ক পরা) একটি প্রাইভেটকার নিয়ে তাদের রিসিভ করেন (তাদের বর্ণনামতে এসি তারেক সেকান্দারের ছবি প্রদর্শন করলে তারা তাকে শনাক্ত করেন)। সেখান থেকে তাদেরকে প্রাইভেটকারে করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে মিথ্যা ভয়ভীতি দেখিয়ে তেজগাঁও থানায় নিয়ে একটি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করানো হয়।
এসি তারেক সেকান্দার নিজে একটি অভিযোগ লিখে নিয়ে আসেন এবং সোর্স দিদারুলের ছেলে সাজ্জাদকে স্বাক্ষর করতে বলেন। সাজ্জাদ রাজি না হলেও জোর করে অভিযোগে স্বাক্ষর করানো হয়। এরপর তাদের ফোন বন্ধ করে দিতে বলেন এবং সংবাদ সম্মেলন করার পরামর্শ দেন। তারা ভয় পেয়ে ফোন বন্ধ করে এসি তারেকের সাথে গাড়িতেই অবস্থান করেন। সন্ধ্যার দিকে এসি তারেক ও তার সহযোগী অপর ব্যক্তি কিছু সময়ের জন্য গাড়ি থেকে নিচে নামলে সাজ্জাদ ফোন অন করেন এবং বাবা দিদারুলকে ফোন দেন।
দিদারুল তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে ঘাবড়ে যান এবং তাদের যেকোনোভাবে পালিয়ে যেতে বলেন। তারা কৌশলে পালিয়ে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে যান। পরে দিদারুলের সাথে দেখা করেন। এরপর তারা সবাই একত্রে মালিবাগের ডিবি অফিসে যান। সেখানে তারা তিনজনই এসব ঘটনার লিখিত ও ভিডিও বর্ণনা দেন।
অভিযান সংশ্লিষ্টদের মোবাইলের সিডিআর ও লোকেশন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়
অভিযানে থাকা সব পুলিশ সদস্যের মোবাইল সিডিআর ও লোকেশন পর্যালোচনা করেছেন পুনারায় তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তারা। ওই পর্যালোচনার কপি ঢাকা পোস্টের হাতে এসেছে।
সেখানে দেখা যায়, সহকারী পুলিশ কমিশনার (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. তারেক সেকান্দার এর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার ০১৬...-৯৩..২৯ এর সিডিআর এ দেখা যায়, ৮ নভেম্বর রাত ৮টা ৩৯ মিনিটে তার টাওয়ার লোকেশন পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় এবং ৯ নভেম্বর সকাল ৭টা ২৬ মিনিটে টাওয়ার লোকেশন পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায়। তিনি অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করা সত্বেও মধ্যবর্তী সময়ে তার মোবাইল ফোনের কোনো টাওয়ার লোকেশন বা অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ রাখেন।
এছাড়া তার ব্যবহৃত সরকারী মোবাইল নাম্বার ০৩২..-০৪৬..৪ এর সিডিআর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৮ নভেম্বর রাত টা ২১ মিনিটে তার টাওয়ার লোকেশন পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় এবং ৯ নভেম্বর সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে মনিপুরী পাড়া এলাকায় টাওয়ার লোকেশন শনাক্ত করা যায়। তিনি অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করা সত্বেও মধ্যবর্তী সময়ে তার ব্যবহৃত সরকারী মোবাইল ফোনের কোনো টাওয়ার লোকেশন বা অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
একইভাবে অভিযানে থাকা অন্য সবার মোবাইলের সিডিআর ও টাওয়ার লোকেশন অভিযানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিজ নিজ ফোন বন্ধ রেখেছেন অথবা লোকেশন নিষ্ক্রিয় করে রেখেছেন।
এর মধ্যে, এসআই মিশন বিশ্বাস, এএসআই মোঃ রফিকুল ইসলাম, কন্সটেবল সালমান রহমান ও ড্রাইভার কন্সটেবল লিপন চন্দ্র রায়দের টাওয়ার লোকেশন ও অবস্থানকালীন সময় কাছাকাছি এবং নিকটবর্তী ছিল। যা তাদের অভিযানের পরদিন অফিস ব্যতীত অন্য কোথাও একত্রিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ ছাড়া সোর্স দিদারুল জবানবন্দি থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত এএসআই জাহিদ হাসান ৯ নভেম্বর বিমানে করে চট্টগ্রাম হতে ঢাকায় আসেন। তার মোবাইল নাম্বার ০১..৪-৫..৯৮১ এর সিডিআর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৯ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তার টাওয়ার লোকেশন বিজয় নগর, সাউথ পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম এবং রাত ১১ টা ২৩ মিনিটে তার টাওয়ার লোকেশন মনিপুরী পাড়া, তেজগাঁও, ঢাকা এবং রাত ১১ টা ৩৫ মিনিটে টাওয়ার লোকেশন পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা এলাকায় সনাক্ত করা যায়। পরবর্তীতে ১০ নভেম্বর ভোর ৬টা ১৩ মিনিটে তার টাওয়ার লোকেশন মনসুরাবাদ, চট্টগ্রাম এলাকায় শনাক্ত করা যায়।
এতে প্রমান পাওয়া যায় যে, এএসআই মো. জাহিদ হাসান চট্টগ্রাম হতে ঢাকায় আগমন ও সোর্স দিদারুলের জবানবন্দিতে উল্লেখিত এসআই মিশন বিশ্বাস, এএসআই সুস্ময় শর্মা সোর্স দিদারুল ও তার সহযোগী আইয়ুব এবং জোবায়েরদের সঙ্গে ঢাকায় মিলিত হয়েছিল।
পৌনে ৪ কোটি টাকার মালিক দ্বারস্থ হয়েছিলেন ডিবির
অনুসন্ধানে নেমে ঢাকা পোস্ট ওয়ারীর বাসায় থাকা পৌনে ৪ কোটি টাকার মালিককে খুঁজে বের করে। কথা হয় ওই টাকার মালিক মো. ফখরুদ্দীনের সাথে।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার বাড়ি চট্টগ্রাম এলাকায়। চকবাজারে আমার কয়েকটি কসমেটিকসের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। পাশাপাশি আমি মালয়েশিয়া থেকে পুরাতন গোল্ড বাংলাদেশে এনে সেগুলো বিক্রি করি। মালয়েশিয়া থেকে যাত্রীদের মাধ্যমে পুরাতন গোল্ডগুলো বাংলাদেশে পাঠাই। পরে সেগুলো তাঁতিবাজার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি।
তিনি বলেন, ডিবি যখন আমার বাসায় অভিযান চালায় তখন মালয়েশিয়াতে ভোর চারটা বাজে। আমি তখন মালয়েশিয়াতে ছিলাম। আমি জানতে পারলাম ডিবি আমার দুটি ছেলেকে (কর্মচারী) ধরে নিয়ে গেছে এবং আমার ঘরে থাকা ৩ কোটি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। ছেলে দুটিকে জাল টাকার মামলা দিয়েছে।
পরে আমি দেশে আসি এবং এসআই মিশন বিশ্বাসের সাথে আমার যোগাযোগ হয়। আমি তাকে জানাই, আপনারা কিছু টাকা রেখে বাকি টাকাগুলো ফেরত দেন। এরপর তার সাথে বেশ কয়েকবার কথা হয়। তিনি এসি তারেক সেকান্দারের সাথে কথা বলে আমাকে জানাবেন বলেন। কিন্তু এরপর আর ফোন ধরেননি।
সুত্র:ঢাকা পোস্ট